For a better experience please change your browser to CHROME, FIREFOX, OPERA or Internet Explorer.

করোনাভাইরাস সময়ের শঙ্কা, আমাদের হুযুগে সচেতনতা এবং প্রশাসনিক উদাসীনতা।

সহজ কিছু নিয়ম, স্বাস্থ্যকর কিছু অভ্যাস আর সাবধানতা অবলম্বন করলেই নিজে নিরাপদ সাথে নিকটজনের ভালো থাকাটাও নিশ্চিত করতে পারি আমরা।

ব্যাপারটা এই- আমার ঘরে আমি সব সম্ভাব্য প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থায় সবাইকে রক্ষা করবো। যেমনটা আমরা করি- ঘুমাতে যাবার আগে নিজ রুমের পরিবেশ ঘুম উপযোগী করতে। আলো নিভিয়ে, জানলার পর্দা নামিয়ে, সাইলেন্স মুড চালু রাখতে সাউন্ড প্রুফ করার তাগিদে বাথরুমের ট্যাপ হতে টপটপ পানি পড়ার একঘেঁয়েমী শব্দও কন্ট্রোল রাখার যথাসম্ভব চেষ্টা করি আমরা। সবশেষে মাশারী টাঙ্গানোর মতো একটা নিত্য অভ্যাসে আমরা নিশ্চিত করি যেন- কোন ফাঁক-ফোকর গলে মশা কোনভাবেই না ঢুকতে পারে। সাধের ঘুমটা নির্বিঘ্ন করতে এবং বাইরের উপদ্রব হতে শান্ত থাকতে আমাদের করণীয় নিয়ে কোন ত্রুটি রাখিনা।

আমরা সবাই জানি প্রতিকারের চাইতে প্রতিরোধ উত্তম। সেই উত্তম পন্থা এখন আমাদেরই হাতে। কোভিড-১৯ সম্পর্কে আমরা সবাই এখন মিডিয়া কল্যাণে অবগত আছি এবং ভাইরাসটার বৈশিষ্ট্য, গতি-প্রকৃতি, মানবশরীরে সংক্রমণের সম্ভাব্য গেটওয়ে (হাত-কান-নাক-মুখ-চোখ) এবং এর সংক্রমণ পরবর্তী উপসর্গগুলো মোটামুটিভাবে কম-বেশী আমরা সকলে জানি।

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং- এ পিপিই ( PPE- Personal Protective Equipment) নামে একটা টার্ম আছে। যখন কোন ইমারজেন্সি সিচ্যুয়েশনের সম্ভাব্য হেজার্ডের রিস্ক এ্যাসেসমেন্ট করা হয় তখন এই টার্মটা কাজে লাগে। সাধারণ ভাবে বলতে গেলে কোন সম্ভাব্য ঝুঁকির সেভেরেটি ( severity) কমাতে এই টার্মটি লাস্ট এফেক্টিভ সেফটি মেজার হিসেবে বিবেচিত হয় যেখানে সম্ভাব্য ঝুঁকিটাকে অন্য কোন উপায়ে আর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়না।

সো, এই কোভিড-১৯ মোকাবেলা এবং নিয়ন্ত্রণে আমরাও নাগরিক সচেতনতা হিসেবে এই শেষ সেফটি মেজার’কে (পার্সোনাল প্রটেকটিভ ইক্যুয়েপম্যান্ট) এপ্লাই করতে পারি যেটা উপরের কথাগুলোর মধ্যে বলার চেষ্টা করেছি।

যখন মহামারিটি চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান হতে শুরু সেই ডিসেম্বরের শেষের দিকে তখন হতে এখন প্রায় আড়াইমাস সময় পর আমরা এই কোভিড-১৯ কে মোকাবেলা করছি। সুতরাং বলাই যায়- যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে নিজদের রক্ষা করার মন্ত্র আমরা জানি।

কিন্তু ১৬ কোটি মানুষের এই দেশে আসলেই কি হচ্ছে??? আমরা কোভিড-১৯ মহামারীর আপদকালীন সময়ের জন্য আদৌ প্রস্তুত আছি কি না!!

আমরা আজও আতঙ্ক এবং সচেতনতা এই নিয়েই দ্বিধা গ্রস্থ আর মন্ত্রী এবং বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগণতো একেকজন এখন মোটিভেশনাল স্পিকার। কেউ বলেন- এটা সাধারণ ফ্লু’র মতোন, মৃত্যুহার খুবি কম, প্রাদুর্ভাব উৎপত্তি দেশ চীনে মৃত্যু হার ২%, আবার সরকার প্রধানের নেত্রিত্বে দেশ করোনা নিয়ন্ত্রণে আছে ব্লা-ব্লা-ব্লা বলেই যাচ্ছেন।

ঘোষণানুযায়ী স্কুল-কলেজ-কেচিং বন্ধ কিন্তু পতেঙ্গা সী-বিচ, বান্দরবন, কক্সবাজার পার্কগুলো জনসমাগমে পূ্র্ণ। অথচ করেনা শনাক্ত হওয়ার একদিনের মাথায় বাজারে সব মাস্ক আর হ্যান্ড স্যানেটাইজার হাওয়া করা আমরা হুযুগে বাঙ্গালীগণ ভ্যাকেশান মুডে দেশের বিভিন্ন স্পটে ট্যুর দিয়ে বেড়াচ্ছি।

এদিকে খোদ নগরপিতা স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোঁয়ানোর ক্যাম্পেইন চালাচ্ছেন এবং পক্ষান্তরে জনসমাগমকে নিরুৎসাহ করার জায়গায় উৎসাহ দিচ্ছেন। আতশবাজির ভেল্কিআয়োজনে মানিকমিয়া এভিনিউ কানায় কানায় পূর্ণ। খুব কৌতুহলী বাঙ্গালী মন সব কিছুতে হয়তো সিরিয়াস না যেমন আমাদের মন্ত্রীসাহেবও বলেন- কোভিড-১৯ মারাত্মক না, সামান্য সর্দি কাশির মতোই সাধারণ কোন ব্যাপার!!! এদিকে আইইডিসিআর কেন প্রতিটা কেইস প্রেস কনফারেন্স করে জানাতে হবে? যেখানে মিডিয়ার জমায়েত হচ্ছে!!! কেন আমরা একটা সেন্ট্রাল ডাটাবেজ বা অ্যাপস তৈরী করে আপটুডেট কেইসগুলো বা পরিসংখ্যান অন-লাইন ভিত্তিক করছি না? যেখানে এশীয়ার অন্য দেশগুলো মালেয়শীয়া, সিঙ্গাপুর প্রত্যেক নাগরিকদের কাছে ২৪ ঘন্টার প্রতিদিনকার আপডেট চলে যাচ্ছে প্রত্যেকের কন্টাক্ট নাম্বারে বা একটা সেন্ট্রাল ডাটাবেজের মাধ্যমে।

যেখানে মিনিমাম সেইফটি মেজার জনসমাগম এড়ানোর এবং পার্সন টু পার্সন ১ মি. (৩ফিট দুই ইঞ্চি) সোশ্যাল ডিসটেন্স নির্ধারণ করা আছে আর আমরা যেন দূরত্বটা কমানোটাকেই এনকারেজ করে যাচ্ছি। সেই নোকিয়া যুগের স্লোগানের মাতো, কানেক্টিং পিপল।

যেখানে তাবত বিশ্ব এই কোভিড-১৯ কে যুদ্ধ বলে ঘোষণা দিচ্ছে। সেখানে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির কোন স্টেইজে আমরা বাংলাদেশীরা??

সরকার ভাইরাসটি শনাক্তকরণ এবং আক্রান্তের সেভেরিটি দেখে ধাপেধাপে বিভিন্ন পথ-পদ্ধতিতে এগুচ্ছে এবং সেই প্রথম দিককার কথা বললে চীন থেকে আমাদের ৩১২ জন শিক্ষার্থীদের দেশে ফেরত আনাসহ কোয়ারান্টাইন ব্যবস্থা সবই এপ্রিশীয়েট করার মতো ছিল। কিন্তু এখন দিনদিন যখন ভাইরাসটা ক্রমেই এই দেশে সবে সংক্রমণ করে চলেছে তখন আমরা সেই বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্যানার হতে বিদেশীদের কি ব্যবস্থায়, কেমন কোয়ারান্টাইন নিশ্চিত করছি তা ডেইলী নিউজগুলো দেখে বা পড়ে হতবাক হতে হয়। দেখা যায় কোয়ারান্টাইনে থেকে দিব্যি সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং করছে, হর-হামেশা ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিদেশফেরত মানুষজন আবার ফ্রান্স প্রবাসী একজন তো কোয়ারান্টাইন থাকাকালীন বিয়েই করে ফেলেছেন। কি কিউট ব্যাপার-স্যাপার। এক বেসরকারী টিভি রিপোর্টের ইন্টারভিউতে দেখলাম হোম কোয়ারান্টাইনে থাকা এক প্রবাসীর স্ত্রী বলছেন- এতোদিন পরে স্বামী দ্যাশে এসেছেন, মায়া-মহবব্ত কাজ করেই। চাইলে দূরে থাকা যায়না। বচ্চা কাচ্চা আছে, বাবাকে কাছে পতে চায়।

ভদ্রমহিলা অমূলক কিছু বলেননি। বরং এটাই বাঙ্গালীর চিরাচরিত আবেগের প্রতিচ্ছবি এবং আমরা এটা জানিও হোম কেয়ারান্টাইনের বাস্তব চিত্রগুলো এমনি হবে। তাহলে প্রশ্ন আমাদের কর্তব্যব্যক্তিগণ কেন এই ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিলেন। বিদেশফেরত বাঙ্গালী মাত্রই তার হোমসিকনেস এবং ফ্যামিলির গেটটুগেদার এবং মেলামেশার আকুলতা হবেই তো হোম কোয়ারান্টাইন দেবার আগে তাদেরকে কি সঠিক গাইডলাইন বা কাউন্সেলিং দেয়া হয়েছিল যাতে পরিস্থিতির গুরুত্ব অন্তত সেই একজনকে সচেতন করা যেত?? তিনি অন্তত নিজেকে আক্ষরিকভাবে কোয়ারেন্টাইনে রাখতেন এবং মেনে চলতেন সমস্ত নিরাপত্তা বিধি!!

ইতালিফেরগণ কিংবা প্রবাসীরা নবাবজাদা কিংবা ফাইভস্টার হোটেলে থাকতেই পারেন কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে উক্তি দিয়ে আমাদের সামগ্রিক অব্যবস্থাপনা কিংবা বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্বের সমন্বয়হীনতা ঢাকা যাবে না। যখন প্রবাসীরা আসছেন’ই এবং এসব এটা একটা অনুমেয় পরিস্থিতি ছিল, তো আমরা কেন এমন ইমারজেন্সি সিটিউশনে নাগরিকদের দেশে ফেরা কিংবা তাদের সঠিক ব্যবস্থাপনায় কার্যকরী সরকারি কোয়ারান্টাইন বা হোম কোয়ারান্টাইন নিশ্চিত করতে পারি নি?

সরকার সবসময় প্রস্তুত এবং উন্নত দেশগুলোর চাইতে ভালো প্রস্তুতিসম্পন্ন এই স্তুতিতেই মন্ত্রী এবং নেতারা ব্যস্ত। আর তারই নমুনা আইইডিসিআর কাছে ১৭৩২ টি কিট রয়েছে, কয়েকটি ইমার্জেন্সী নাম্বার এবং এক ঢাকাকেন্দ্রিক রোগ শনাক্তকরণ এবং পরবর্তী চিকিৎসা ব্যবস্থা। চীন তাদের টেকনোলজির সর্বোচ্চ ব্যবহার করেই এখন সফলতা পাচ্ছে। ইটালির মতো দেশ সময়ক্ষেপনের আফসোস এবং মেডিক্যাল রিসোর্সর আভাবে আছে। আর ২.৫ মাস সময় পেয়ে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে এক আইইডিসিআর নির্ভর সনাতন পদ্ধতিতে পড়ে আছি আমরা মহামারি ঘোষিত কেভিড ১৯ যুদ্ধে।

মনে রাখা ভালো-

এই কোভিড-১৯ সাম্যবাদী ভাইরাস। শুধু আমরা আমজনতা আর গরীবেরা না, দেশের হর্তা-কর্তা, বুলি আওড়ানো মুখপাত্রগণ, রথী-মহারথীরাও তার প্রিয় বাহক হতে পারে।

ফয়সাল সাইফুল
শিক্ষার্থী
ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি মালেয়শীয়া।

Top