নোয়াখালী জিলা স্কুল সম্পর্কে অজানা কিছু ইতিহাস

    নোয়াখালী জিলা স্কুল সম্পর্কে অজানা কিছু ইতিহাস

    নোয়াখালী জিলা স্কুল বাংলাদেশের নোয়াখালীর জেলার মাইজদী কোর্ট শহরে অবস্থিত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। জন্মলগ্ন থেকেই এটি সরকারি স্কুল। এটি তৈরিতে আয়ারল্যান্ডের ইংরেজ কর্মকর্তা মি.জোনসের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। ১৮৫০ সালে জনাব জোনস, আয়ারল্যান্ড এর একজন ব্রিটিশ কর্মকর্তা নোয়াখালী জিলা স্কুল নোয়াখালী জেলার পুরানো শহরে
    নোয়াখালী জিলা স্কুল বেসরকারি ভাবে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তী তিন বছরের মাথায় সরকারি ভাবে এটি একটি হাই স্কুল (আরকে হাই স্কুল) রুপে প্রতিষ্ঠা লাভ করে ।

    ১৯২০ সালে স্কুলটি মেঘনার ভাঙ্গনে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। তারপর ১৯২১ আবার পূর্ব মোহাববতপুরে স্থানান্তর করা হয় আরকে জুবলি স্কুল নামে কিন্তু এটি আবারও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এরপর ১ জানুয়ারী ১৯২৩ আরকে জুবলি স্কুল আবারও স্থানান্তরিত হয় এবং এটিকে আরকে জুবলি স্কুল থেকে আরকে জিলা স্কুল নাম পরিবর্তন করা হয়।

    ১৯৩১ সালে স্কুল আবার নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে এই স্কুলকে পুনরায় ১৯৫৩ সালে স্থানান্তর করা হয় বর্তমান জায়গায় (মাইজদীতে) এবং আরকে জিলা স্কুল থেকে নাম পরিবর্তন হয়ে নোয়াখালী জিলা স্কুল করা হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় ১৯৫৮ এবং ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে এটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে এটি পুনর্নির্মিত হয়। এত ত্যাগের পরেও আজও শীর্ষ স্থানে দাড়িয়ে আছে আমাদের নোয়াখালী জিলা স্কুল।

    নোয়াখালী জিলা স্কুল "পিটি"ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, পরিবেশের অপরূপ এক মেলবন্ধন সৃষ্টি করেছে মাত্র ৭.৩৮ একরের উপর প্রতিষ্ঠিত নোয়াখালী জিলা স্কুল। স্কুলের অডিটোরিয়াম থেকে শিক্ষক মিলনায়তন পর্যন্ত দীর্ঘ গাছগুলো ছায়া হয়ে সঙ্গী হয় পথের, শিক্ষক মিলনায়তনের কোল ঘেঁষে বেড়ে ওঠা কৃষ্ণচূড়া গাছ লাল হয়ে বৃদ্ধি করে শহীদ মিনারের সৌন্দর্য, ক্লাসরুমের পেছনের সুবিশাল পুকুর, প্রধান শিক্ষকের পরিত্যক্ত বাসভবনের ইতিহাস, সাইকেল স্ট্যান্ডের পাশের বট গাছটার নিচে নববর্ষ উদযাপন এবং পার্শ্ববর্তী নোয়াখালী জেলা জামে মসজিদ বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে জিলা স্কুলের গুরুত্ব। ছাত্র-শিক্ষকদের অসাধারণ মেলবন্ধনে অপ্রতিরোধ্য গতিতে প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাচ্ছে স্কুলটি। শ্রেণীর পাঠ্য কার্যক্রমে শিক্ষকদের ভূমিকা অসাধারণ। শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরা তাদের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করেন ছাত্রদের মাঝ থেকে সেরা ফলাফল বের করে নিতে। তাই শিক্ষকদের দিক-নির্দেশনা বরাবরের মতোই প্রশংসনীয়। পাশাপাশি ছাত্রদের সমর্থন জিলা স্কুলের এত বছরের পথচলায় সফলতার মূলমন্ত্র, যার ফলস্বরূপ বিগত কয়েক দশকে সকল পরীক্ষায় পাশের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে নোয়াখালী জেলায় শীর্ষে অবস্থান করে আসছে নোয়াখালী জিলা স্কুল। এভাবেই দিনপঞ্জিকার পাতা বদলে সময় যত পেরিয়েছে, স্কুলটি ততই সমৃদ্ধ হয়েছে।

    সহশিক্ষা কার্যক্রমে নোয়াখালী জেলায় সবার চেয়ে এগিয়ে নোয়াখালী জিলা স্কুল, যা অন্যান্য স্কুলের জন্য ঈর্ষণীয়। দিবা ও প্রাতঃ- দুই শাখার ক্লাস শুরু হওয়ার পূর্বে পিটি তথা শরীরচর্চা কার্যক্রমে ছাত্রদের পাশাপাশি সকল শিক্ষক অংশ নিয়ে একসাথে জাতীয় সঙ্গীতে কণ্ঠ মেলান। বিএনসিসি, স্কাউটিং, রেড ক্রিসেন্ট ফাংশন, ক্রীড়া (ক্রিকেট , ফুটবল, ব্যাডমিন্টন ), বিতর্ক, স্কুল মডেল ইউনাইটেড নেশনস, বিজ্ঞান মেলা, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কর্মসূচি, শিক্ষা সফর নিয়মিত হয়ে থাকে। ক্রীড়া, স্কাউটিং, বিএনসিসি, রেড ক্রিসেন্ট এবং বিতর্কে জেলা ছাড়িয়ে বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে অংশ নিয়ে আসছে জিলা স্কুলের ছাত্ররা। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় জিলা স্কুলের বিশাল মাঠ অলিম্পিকের মাঠের ন্যায় রূপ ধারণ করে। অলিম্পিকের মতো এখানেও মশাল হাতে একজন শিক্ষার্থীকে মাঠ প্রদক্ষিণ করানো হয়।

    জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা শিক্ষাজীবন শেষ করে দেশকে সেবা করার মহান ব্রত নিয়ে এগিয়ে চলে। এ স্কুলের উল্লেখযোগ্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী সার্জেন্ট জহুরুল হক, প্রয়াত প্রখ্যাত সাংবাদিক এবিএম মূসা, সাবেক সচিব প্রয়াত সা’দত হোসেন, সাবেক সচিব ও রাষ্ট্রদূত এএইচ মোফাজ্জল করিম, প্র‍য়াত শহীদউদ্দীন এস্কান্দার কচি (খেলোয়াড় ও রাজনীতিবিদ), মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতিবিদ মেজর (অবঃ) আব্দুল মান্নান যিনি তিন মেয়াদে ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত এবং বঙ্গে এই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মুজাফফর আহমদ, প্রকৌশলী ফজলুর করিম, প্রয়াত আব্দুর রশিদ (এম.পি), এমাদ উদ্দীন, জামাল উদ্দীন, কর্নেল (অব:) সালাউদ্দীন, ডা. বাহার, প্রফেসর গাজী আহসানুল কবির এবং ওয়েডিং ডায়েরির স্বত্ত্বাধিকারী প্রীত রেজাসহ আরও অনেকে।

    বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে স্বাধীনতা যুদ্ধ অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। জিলা স্কুলও জড়িত রয়েছে সে ইতিহাসের আষ্টেপৃষ্ঠে। পৃথিবীর মানচিত্রে ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ নামটি স্থান পাওয়ার ক্ষেত্রে অবদান কম ছিল না জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীদের। তৎকালীন জিলা স্কুলের অসংখ্য শিক্ষার্থী অংশ নেয় স্বাধীনতা যুদ্ধে। তাদেরই কয়েকজন ড. শাহাদাত হোসেন সিএসপি, মিজানুর রহমান, মাহমুদুর রহমান বেলায়েত (বিএলএফ কমান্ডার), এ.কে আযাদ (আযাদ কমিশনার), একরামুল হক। অহিদুর রহমান, জসিম উদ্দীন, ক্যাশ সরকার, বিশ্বেশ্বর দে সহ কয়েকজন শাহাদাত বরণ করেন স্বাধীনতা যুদ্ধে। ত্রিশ লক্ষ শহীদের তালিকায় রয়েছে জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীদের নামও।

    দেশের সংকটাপন্ন অবস্থায় সবসময় এগিয়ে এসেছে জিলা স্কুলের শিক্ষার্থী ও কর্তৃপক্ষ। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে নোয়াখালীতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলো জিলা স্কুলের ছাত্ররা। চলমান করোনাভাইরাস আতঙ্কে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে নোয়াখালী জিলা স্কুলের মাঠ ব্যবহৃত হচ্ছে অস্থায়ী কাঁচাবাজার হিসেবে। সকল পরিস্থিতিতে এভাবেই যুগ যুগ ধরে বুক পেতে দেয় নোয়াখালী জিলা স্কুল।

    Top