For a better experience please change your browser to CHROME, FIREFOX, OPERA or Internet Explorer.

নোয়াখালী: আতিথিয়তা ও সংস্কৃতি

আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক-ভৌগোলিক প্রভৃতি কারণে অঞ্চলবেধে সংস্কৃতি ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা রুপ ধারণ করে। তাই একটি দেশের সামগ্রিক লোকসংস্কৃতি এবং একটি বিশেষ অঞ্চলের লোকসংস্কৃতিতেও অনেক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।

নোয়াখালী জেলা প্রাচীন সমতট জনপদের একাংশ। তাই স্বাভাবিক ভাবেই জেলার লোক সংস্কৃতিতে তার একটি পরিচ্ছন্ন ছাপ দেখা যায়। বহু ভাঙ্গা-গড়া, চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আজকের নোয়াখালী যা এক সময় সম্ভাবনাময় সমৃদ্ধ জনপদ ছিল। এ অঞ্চলের লোক সংস্কৃতির প্রতি দৃষ্টি দিলে সহজেই অনুমান করা যায় যে, এ অঞ্চলের একটি সমৃদ্ধ লোক সংস্কৃতির ইতিহাস রয়েছে।

লোক সংস্কৃতির একটি প্রধানতম শাখা লোকসাহিত্য। নোয়াখালীর লোক সাহিত্য এ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেকটা সমৃদ্ধ এবং জীবনের সাথে সর্ম্পকিত।আর এর প্রমাণ পাওয়া যায় এ অঞ্চলের প্রবাদ-প্রবচন, আঞ্চলিক গান, ধাঁ-ধাঁ, ছড়া থেকে।

 

প্রবচনের কথাই ধরা যাকঃ

“মাইনষের কুডুম আইলে গেলে, গরুর কুডুম লেইলে হুঁইছলে”

এ প্রবচনটি ভাবার্থ হলো-মানুষের কুটুম্বিতা (আতিথেয়তা) বুঝা যায় পরস্পরের আসা যাওযার মাধ্যমে, আর গরুর তা বোঝা যায় লেহনের মাধ্যমে। উপরের প্রবচনের অর্থের থেকে এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ যে ঐতিহ্যগতভাবেই আত্মীয়তার সর্ম্পক তা বুঝতে বাকী থাকার কথা নয়।

“ ঝি থাইকলে জামাইর আদর, ধান থাইকালে উডানের আদর।”

এ প্রবচনটির সরল অর্থ হচ্ছে -কন্যার কারণেই মানুষ কন্যা জামাতাকে খাতির করে , আর ধান প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রয়োজনেই মানুষ উঠানের যত্নকরে।

উঠানে ধান ঝাড়ছেন এক কৃষাণী

কিন্তু এসব প্রবচনের মূলে যে সুক্ষ্ম দার্শনিক দিক রয়েছে তা কি আমরা ভেবে দেখার অবকাশ পাই?

“মাছ ধোঅন হিঁড়া, গোস্ত দোঅন মিড়া”

এ প্রবচনের মধ্য দিয়ে- নবীন কোন রাঁধুনীকে শেখানোর চেষ্টা করা হয় যে, রান্নার আগে মাছটা খুব ভালোভাবে ধুতে হয় এবং মাংসটা অপেক্ষাকৃত কম ধুতে হবে। সাধারণ গার্হস্থ্য শিক্ষা ছাড়াও এ প্রবচন এটাই প্রমাণ করে যে, এ অঞ্চলের মানুষ সুদীর্ঘ সময় ধরেই মাছ, মাংস খেয়ে অভ্যস্থ।

“না হাইত্তে খায় হুরি, না হাইত্তে করে চুরি” এ প্রবচনের শিক্ষা হচ্ছে-মাছের সংকট বলেই মানুষ যেমন বাধ্য হয়েই শুটকি খায় তেমনি নিতান্ত বাধ্য হয় বলেই মানুষ চুরি করে। দার্শনিক এ শিক্ষার পাশাপাশি এ প্রবচনে চাটগাঁর মত শুটকি যে এ অঞ্চলের নৈমিত্তিক খাবার নয় তাও কিন্তু বুঝতে কষ্ট হয় না।

নিজের পালিত হাঁস।মেহমান আসলে পড়ে জবাই করার হিঁড়িক।

“ হৈল হোনা গজার হোনা, যার যার হোনা তার তার হোনা”

এ প্রবচনে সন্তানের প্রতি ভালোবাসার সাথে সাথে আত্মমুখী ভালোবাসার জন্মগত বিষয়টি ফুটে উঠে। শোল মাছ, গজার মাছ যেগুলি কিনা রাক্ষুসে মাছ, যারা অন্য মাছের পোনা অবলীলায় খেয়ে সাবাড় করে। কিন্তু তারা নিজ নিজ পোনাকে সোনা যেমন মূল্যবান ধাতু হিসেবে মানুষ আগলে রাখে তেমনি আগলে রাখে।

উপরিউক্ত প্রবচন পাঁচটির মত হাজারো প্রবচন এখানকার লোকমুখে প্রতিনিয়তই ফিরছে। শুধু আমরা তা মনোযোগী হয়ে আমলে নিইনি, নেইনা।

 

আঞ্চলিক গানের ক্ষেত্রে যদি একটু দৃষ্টি দেই তাহলে আমরা বুঝতে পারব এই অঞ্চলের মানুষের নিজ এলকার প্রতি কতটা ভালোবাসা। যেমন-“ ইদ্দুরিতান মাইজদী শঅর এত্ত লাগে বালা, যদিও নাই এ শঅরে হাঁচ তালা দশ তালা”

এই রকম গীত যখন বাজতে থাকে তখন কোট-টাই পড়া সাহেবরা গীতওয়ালার দিকে না তাকালেও অনেক্ষন যে সেই দিকে কান সজাগ করে থাকে তা নির্দ্বিয়ায় বলা যায়।

“আঙ্গো বাড়ি নোয়াখালী রয়েল ডিস্টিক ভাই” এ গান আঞ্চলিক সাহিত্য সম্ভারে নোয়াখালী যে সঙ্গিতোপযোগী তারই স্বাক্ষর রাখে ।

আঞ্চলিক গান

“আষ্ট ঠেং হোল আঁডু, তার নাম রাম টাডু, মাছ ধইত্তে যায়রে টাড়ু, হুউনাত হাতি জাল, মাছ খায় চিরকাল”

মাকড়শাকে নিয়ে রচিত এ ধাঁ-ধাঁ আট পা বিশিষ্ট এ জীবের জীবন সমীক্ষণে যে গভীর পর্যবেক্ষণের পরিচয় ফুটে উঠে তাতে আমাদের পুর্বসুরীদের মেধার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জাগাতে বাধ্য।

এরকম- “ উডান ঠন ঠন হিঁড়াত বাড়ী, ধলা হিরিসতার হোন্দে দাঁড়ি”।

“ কেরে ভাই চৈতি রাঙ্গা, গাছের আগাত হৈল হো’না”।

“ বনের তোন্ বার অইল ভুতি, ভাত বেড়াই দিল মুতি”

যথাক্রমে- রসুন, খেজুর, লেবু বুঝায়।

আজকের আকাশ সংস্কৃতির বদৌলতে আমাদের কাছ থেকে বহু বিষয়ই হারিয়ে যাচ্ছে।। যাত্রা, পালাগান এসবই আজ সেকেলে । তারপরেও এই অঞ্চলের লোক সাহিত্য আজও মানুষের মুখে ও মননে গেঁথে আছে। লোক-সাহিত্যের কথা বাদ দিলেও এ অঞ্চলের জন জীবনে যে ঐতিহ্য লালিত তার শিল্প বোধ ঈর্ষণীয় বলতে হবে।

আপনি যদি নাগরিক সংস্কৃতির বলয় থেকে বেরিয়ে গ্রামে ঘুরেতে যান, আতিথ্য গ্রহণ করেন, আপনার দৃষ্টিতে গেঁয়ো কোন মানুষের আতিথ্যে মুগ্ধ হবেনই। শুরু থেকে ফেরা পর্যন্ত আপনি পাবেন নানা ঐতিহ্যের স্বাক্ষর। দেখবেন আপনাকে বসার জন্য যে পাটি বা বিছানা দেয়া হয়েছে তাতে রয়েছে যত্নে বোনা কারুকর্ম। হয়তো তারই ওপর বিছিয়ে দেয়া হয়েছে একখানা চাদর যাতে যতেণ করা সুচিশিল্প কিংবা এককোণে সুই সুতায় আঁকা বিচিত্র বনফুল আপনাকে আকৃষ্ট করবে।

অতিথি আসলে এইভাবে আলিঙ্গন করে ঘরে নেন আমাদের মায়েরা।

সত্যিকার অর্থে জীবনকে উপভোগ করে এই অঞ্চলের মানুষ। মানুষের জন্য আতিথিয়তার শেষ নেই তা হোক নিজের জেলার, হোক অন্য জেলার। আমোদের সংস্কৃতি আরো সমৃদ্ধ হোক এই প্রত্যাশা।

@মুহাম্মদ মাঈনুদ্দিন।

তথ্যসূত্র: জাতীয় তথ্য বাতায়ন,নোয়াখালী জেলা।

Top