For a better experience please change your browser to CHROME, FIREFOX, OPERA or Internet Explorer.

পরিকল্পনা গুলো পরিবর্তন করে দিতে জেলার ভবিষ্যত অবকাঠামো

হাজার বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে উঠা ঐতিহ্যবাহী নোয়াখালী পুরাতন শহর ছিল দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গের একটি অন্যতম প্রাচীন সমৃদ্ধ জনপদ । মেঘনা-বঙ্গোপসাগর মোহনায় অবস্থিত হওয়ায় নৌ ও সাগর পথে যুগে যুগে আর্য, আনার্য, আরব,মোঘল,পারসিক, গ্রীক, ওলন্দাজ, পর্তুগীজ, ইংরেজ ও নানা জাতি-বর্ণ ও ধর্মের মানুষের আবির্ভাবে এ অঞ্চলে গড়ে উঠে এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও জনপদ। অবস্থানগত কারনে গোড়াপত্তনের পর থেকে থেমে থেমে বিভিন্ন সময় উত্তাল মেঘনা ও ভয়াল বঙ্গোপসাগরের মিলিত রুদ্র রোসের শিকার হয়ে বহু বার ক্ষত বিক্ষত হয়েছে নরম পলির এ জনপদ। বিংশ শতাদ্বীর শুরুতে হঠাৎ বেড়ে যায় ভাঙ্গনের হার, ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে অবশেষে বিংশ শতাদ্বীর মাঝামাঝিতে বৃটিশ শাসনের শেষ পর্যায়ে সকল সৌধমালা, বৃক্ষরাজি, হাঁট বাজার, বিপণি বিতান, বসতি ও সকল ঐতিহ্য সহ পুরো শহর বিলীন হয়ে যায় অতল সাগর গর্ভে। আবশেষে সোনাপুর পর্যন্ত এসে থামলো ভাঙ্গন, পুরনো শহরের কিছুই আর অবশিষ্ট রইলোনা । আর তখন থেকেই নোয়াখালীর মানুষ হতে শুরু করলো ব্যাপক হারে বহির্মুখী। পুরনো শহরের ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী ও বিভিন্ন পেশাজীবীরা ছড়িয়ে পড়লো দেশের বিভিন্ন প্রন্তরে এবং দেশের বাইরে। এ কারনেই আমদের দেশে একটি জনপ্রিয় প্রবাদ প্রচলিত আছে,”চাঁদের দেশে গেলেও নোয়াখাইল্লা পাওয়া যায়”। আর এদের বেশির ভাগই স্ব স্ব ক্ষেত্রে নিজ নিজ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে অবদান রেখে গেছেন। কিন্তু কিছু মানুষ মাটির টানে রয়ে গেল নোয়াখালীতেই। আর তারাই প্রজন্মান্তরে বয়ে নিয়ে এসেছে ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা ।

জেলা শহর বিলীন হয়ে যাওয়ায় , নতুন করে জেলা শহর স্থানান্তরিত হবার কথা ছিল ফেণীতে। কিন্তু ভাঙ্গন থেমে গেলে আবার নতুন আশায় বুক বাধে এ অঞ্চলের মানুষ। অবশেষে জেলা শহর স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয় পুরনো শহরের থেকে ৮ কিমি উত্তরে মাইজদী মৌজা ও আশেপাশের কয়েকটি গ্রাম নিয়ে, যেগুলো ছিল নিতান্তই জলাভূমী অধ্যুসীত অনঅগ্রসর গ্রাম। ১৯৫০ সালে উত্তর দক্ষিনে সোনাপুর-বেগমগঞ্জ চৌরাস্তা একটি প্রধান সড়ক তৈরি করে এর দুপাশে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে নতুন শহরের গোড়াপত্তন হয়, যার নাম হয় মাইজদী। আর তাই আপনি দেশের অন্যান্য পুরনো জেলাশহর গুলর মত এখানে কোন পুরনো ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা, প্রচীন নাম ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাবেন না। বর্তমানে সোনাপুর থেকে দক্ষিনে মূল ভুখন্ডের সাথে নতুন করে প্রায় ৩৫-৪০ কিমি ভূমি সাগর বক্ষ থেকে যুক্ত হয়েছে আর সেখানে সরকার অর্থনৈতিক অঞ্চল ও অন্যান্য উন্নয়ন পরিকল্পনা করছে।

সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা যে কোন নগর বা সভ্যতা গড়ে উঠা ও উন্নয়নের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যাবশ্যকীয় পূর্ব শর্ত । বিশ্বের সকল বড় বড় শহর/নগররের পত্তন হয়েছে উত্তম যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করেই। অথচ মাইজদী শহর হয়ে পড়েছে এক রাস্তার শহর, এই একটি রাস্তাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, অফিস আদালত, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও সেবাকেন্দ্র সমূহ। যার ফলে শহরের ব্যাপ্তি ঘটে ৮-১০ কিমি ব্যাপী উত্তর দক্ষিনে লম্বা লম্বিতে। কিন্তু শহরে প্রধান সড়কের বিকল্প কোন সড়ক না থাকায় পূর্ব-পশ্চিমে শহরের ব্যাপ্তি ঘটেনি, প্রধান সড়ক থেকে মাত্র ১ কিমি পূর্ব-পশ্চিমে গেলেই গ্রামের দেখা পাওয়া যায়। আর নতুন করে যেসব সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা গড়ে উঠছে সেগুলোও হচ্ছে একমাত্র প্রধান সড়ককে কেন্দ্র করে অথবা সোনাপুরেরে দক্ষিনে নতুন জেগে উঠা ভূমিতে। যার ফলে পূর্ব-পশ্চিমে মূল শহরের প্রসার হচ্ছে না। তাই মূল শহরে নতুন কিছু সড়ক (পূর্ব-পশ্চিমে) ও প্রধান সড়কের বিকল্প কিছু সড়ক গড়ে তুলে তার পাশে বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুল্লে মূল শহরের প্রসার ঘটবে। দেশব্যাপী উন্নয়নের সাথে সাথে নোয়াখালীকে কেন্দ্র করে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা চলছে। প্রধান সড়কটি ১২০ফিট প্রশস্থ চার লেনে রুপান্ত্বরের কাজ চলমান রয়েছে, কিন্তু শররের ভিতরে ভূমি অধিগ্রহন নিয়ে ভূমি মালিকদের সাথে জটিলতা চলছে, ফলে মূল শহরের ভিতরে কাজের অগ্রগতি থমকে আছে। তাই বর্তমানে এতটা আবশ্যকীয় না হলেও ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে জেলা প্রশাসন ও পৌর-কর্তৃপক্ষ নিচের পদক্ষেপ গুলো বিবেচনায় নিয়ে শহরের জন্য মাস্টারপ্লান প্রণয়ন করলে শহরের প্রসার ঘটবেঃ

(১) দত্তের হাঁট গরু বাজারের পাশ থেকে সেন্ট্রাল রোডটিকে হরিনারায়নপুর- মাইজদী বার্লিন্টন মোড় – সার্কিট হাউজ- পাঁচ রাস্তার মোড়- ম্যাট্স- নতুন কলেজ- এতিম খানা রোড হয়ে মাইজদি বাজার পর্যন্ত ডিভাইডার সংযুক্ত করে ৭০-৮০ ফিট প্রশস্ত করা হলে , শহরের একটি বাইপাস সড়ক হিসেবে ব্যাবহার করা যেতে পারে। একই সড়কের আরেকটি শাখা টেলিভিশন সেন্টারের উত্তর পাশ থেকে, নতুন কলেজ রোডের সাথে যুক্ত করা যেতে পারে।

(২) দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে, শহরের চার পাশ ঘিরে একটি আউটার সার্কুলার রোড (১২০ফিট প্রশস্থ) তৈরি করা খুবি আবশ্যিক। প্রস্তাবিত সড়কের একটি প্রান্ত গাবুয়া থেকে শুরু হয়ে পশ্চিমে যেয়ে শহরের পশ্চিম প্রান্ত ঘেঁষে সোনাপুর বাস স্টান্ডের দক্ষিনে কালিতারার উত্তরে যেয়ে মিলবে । বর্তমানে ১২০ ফিট করে ভূমি অধিগ্রহন করে ৪০ ফিট প্রশস্ত সড়ক নির্মাণ করলে পরবর্তীতে ভূমি অধিগ্রহন নিয়ে আর জটিলতা থাকবেনা।

অপর প্রান্ত (১২০ফিট প্রশস্থ) গাবুয়া থেকে শুরু হয়ে শহরের পূর্ব প্রান্ত ঘেঁষে মাইজদী স্টেশানের পূর্ব দিয়ে যেয়ে আশ্বদিয়া কবির হাঁট রোডে মিলবে।

(৩) শহরের অন্য বড় রাস্তা গুলোকে ডিভাইডার সংযুক্ত করে ৭০ ফিট প্রশস্ত করে পূর্ব-পশ্চিমে ২-এ বর্ণিত সার্কুলার রোডের সাথে যুক্ত করা যেতে পারে। এতে ১০ফিট রাখা যেতে পারে রাস্তার দুই পাশে ড্রেন ও ফুটপাতের জন্য।

ক) মাইজদী বাজার – হাসান হাঁট রোড (পূর্বে যেয়ে ২-এ বর্ণিত সার্কুলার রোডের সাথে মিলবে)
খ) মাইজদী বাজার-নতুন পুলিশ লাইন রোড (পশ্চিমে ২-এ বর্ণিত সার্কুলার রোডের সাথে মিলবে)
গ) নতুন বাসস্টান্ড- মধুপুর রোড (পশ্চিমে ২-এ বর্ণিত সার্কুলার রোডের সাথে মিলবে)
ঘ) নতুন বাসস্টান্ড থেকে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারের পাশ দিয়ে পূর্বে যেয়ে ২-এ বর্ণিত সার্কুলার রোডের সাথে মিলবে ।
ঙ হাসপাতাল রোড (পশ্চিমে ২-এ বর্ণিত সার্কুলার রোডের সাথে মিলবে)
চ) সুধারাম থানা-পেট্রল পাম্প থেকে এম এ রশিদ স্কুলের পাশে ১-এ বর্ণিত রোডের সাথে মিলবে।
ছ) জামে মসজিদ রোড (পূর্বে যেয়ে ২-এ বর্ণিত সার্কুলার রোডের সাথে মিলবে)
জ) জামে মসজিদ থেকে পশ্চিমে ইসলামগঞ্জ সড়ক (পশ্চিমে ২-এ বর্ণিত সার্কুলার রোডের সাথে মিলবে)
ঝ) বাঁধের হাঁট সড়ক (পশ্চিমে ২-এ বর্ণিত সার্কুলার রোডের সাথে মিলবে)
ঞ) দত্ত বাড়ির মোড় থেকে পূর্বে (পূর্বে যেয়ে ২-এ বর্ণিত সার্কুলার রোডের সাথে মিলবে)
ট) সোনাপুর থেকে পশ্চিমে, ইসলামিয়া মাদ্রাসা হয়ে ২-এ বর্ণিত সার্কুলার রোডের সাথে মিলবে

(৪) ২-এ বর্ণিত সড়কের পশ্চিম প্রান্তের সাথে চৌরাস্তা-লক্ষিপুর সড়কের একটি সংযোগ (১০০ ফিট প্রশস্ত) তৈরি করা যেতে পারে। আর পূর্ব প্রান্তের সাথে চৌরাস্তা-ফেনী সড়কের একটি সংযোগ (১০০ ফিট প্রশস্ত) তৈরি করা যেতে পারে ।

ছবিতে প্রস্তাবিত সড়ক গুলোর আউটলাইন সিরিয়ালি দেয়া আছে।

লেখকঃ সাইফুল ইসলাম ডাগর

Top