For a better experience please change your browser to CHROME, FIREFOX, OPERA or Internet Explorer.
কালোমানিক খ্যাত ভিপি মোহাম্মদ উল্যাহ

কালোমানিক খ্যাত ভিপি মোহাম্মদ উল্যাহ

জন্মঃ ১০ মে ১৯৫১ ইং
মৃত্যুঃ ১৫ মে ২০২১ ইং (সময় দুপুর ১ টা ১৫ মিনিট)

১৯৬২ সালে জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নোয়াখালীতে সফরকালে বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনী রেল স্টেশনে শ্লোগান দেওয়া অবস্থায় মোহাম্মদ উল্লাহ নামের ১১ বছর বয়সের ছোট্ট ছেলেটি প্রথম বঙ্গবন্ধুর নজরে আসে এবং সেখান থেকেই ছোট্ট মোহাম্মদ উল্যাহকে শেখ মুজিবুর রহমান ট্রেনে নিজের বগিতে সাথে নিয়ে জেলা সফর করেন। ভিপি মোহাম্মদ উল্যাহ তখন মাত্র ১১ বছর বয়সী চৌমুহনী মদন মোহন হাইস্কুলের ৭ম শ্রেনীর ছাত্র, মূলত সে সময় থেকে তিনি প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে একই সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশ গ্রহন করেন।

১৯৬৫ সালের শেষের দিকে ডিফেন্স পাকিস্তান আইনযুনায়ী (ডিপিআর) তাকে গ্রেফতার করা হয়। মেট্রিক পরীক্ষার একাংশ তিনি জেলে থেকে দেন। একই সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর পাকিস্তানের লাহোরে জাতীর জনক ৬ দফা দাবী ঘোষনা করেন এবং ভিপি মোহাম্মদ উল্লাহ ৬ দফা দাবীতে জনমত তৈরিতে বিভিন্ন জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার কারণে পুনরায় গ্রেফতার হন।

১৯৬৬ সালের ৭ জুন বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবী এবং ৬ দফার সমর্থনে হরতালের আগের দিন ভিপি মোহাম্মদ উল্যাহ গ্রেফতার হন। ১৯৬৭ সাল থেকে ৭০ সাল পর্যন্ত তিনি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ৬ দফার বই বিক্রির নামে ঢাকায় অবস্থান করে এবং বাইতুল মোকাররম মসজিদের সামনে প্রতিদিন বিকালে সভা সমাবেশ অব্যাহত রাখেন আর এসব কারণে তিনি একাধিকবার গ্রেফতার হন।

১৯৬৭ সালে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্রের মিথ্যা মামলার প্রতিবাদে সারা বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম চৌমুহনী কলেজ থেকে মিছিল বের হয় এবং যার মধ্যে সবচাইতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে ছিলেন ভিপি মোহাম্মদ উল্যাহ

১৯৭০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারী মাওলানা মওদুদির সভা পন্ড ও মিথ্যা হত্যা মামলায় তাকে আসামী করে গ্রেফতার করা হয়। বঙ্গবন্ধু সে সময় নিজেই মোহাম্মদ উল্যাহকে উক্ত মামলা ছাড়িয়ে আনেন। একই সালে চৌমুহনী কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবীর প্রেক্ষিতে তাকে ঢাকা থেকে এনে চৌমুহনী কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচন করতে দল থেকে বাধ্য করা হয় এবং তিনি বিপুল ভোটে পূর্নপ্যানেল জয়লাভ করেন। ১৯৭১ সালে তিনি নোয়াখালী জেলা স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক নির্বাচিত হন।

মুক্তিযুদ্ধে তিনি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের চোত্তাখোলায় ফেনী জেলার মরহুম এমপি খাজা আহম্মদ ও মরহুম এম এ আজিজ সাহেবের সাথে ক্যাম্প নির্মাণে সক্রিয় অংশ গ্রহন করেন এবং জেলা থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক যুবক-তরুনদের তিনি সেখানে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। জেলা মুজিব বাহিনীর প্রধান মাহমুদুর রহমান বেলায়েত এর বিশ্বস্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর দলের কঠিন সময় তিনি জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘদিন আহার অনিয়মে ১৯৭৪ সালে তিনি আলসারে আক্রান্ত হন। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধে জেলা মুজিব বাহিনীর প্রধান এবং চাটখিলের এমপি মাহমুদুর রহমান বেলায়েতের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু জানতে পারেন ভিপি মোহাম্মদ উল্যাহ আলসারে আক্রান্ত। তৎক্ষণাত বঙ্গবন্ধু সরকারী গাড়ি পাঠিয়ে নোয়াখালী থেকে ভিপি মোহাম্মদ উল্যাহকে ঢাকায় নিয়ে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে ভর্তি করেন এবং বঙ্গবন্ধু নিজে তাকে হাসপাতালে দেখতে যান। শেখ কামাল প্রায় তাকে দেখতে হাসপাতালে আসতেন। দীর্ঘ ৩ মাস হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে তিনি সুস্থ হয়ে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আবার চৌমুহনী কলেজ ছাত্রসংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহন করতে বাধ্য হন এবং প্রতিপক্ষ দল অংশ গ্রহন না করায় তাকে আবার ভিপির দায়িত্ব পালন করতে হয়।

১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করার পর ১৫ আগষ্ট সকালে পুরাতন এমপি হোস্টেলে খন্দকার মোস্তাক আহমেদ সরকারের সমর্থিত সংসদ ও অন্যান্য অনেকেই নিয়ে মরহুম ওবায়দুর রহমান সভা ডাকেন, উক্ত সভায় ভিপি মোহাম্মদ উল্যাহ তাকে প্রশ্ন করেন-আপনারা সবাই বেঁচে আছেন কিন্তু কি অপরাধে বঙ্গবন্ধু স্বপরিবারে লাশ হয়ে ৩২ নাম্বারে পড়ে আছেন? তখন ওবায়দুর রহমান সাহেবের সাথে তর্ক-বিতর্কে জড়ালে কয়েকজন সংসদ ও আর্মি সদস্যরা ভিপি মোহাম্মদ উল্যাহকে সভা থেকে বের করে দেন। তিনি সেখান থেকে বের হয়ে ছদ্মবেসে নোয়াখালীতে চলে আসেন এবং সন্ধা ৭ টায় বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে চৌমুহনীতে বিশাল মিছিলের নেতৃত্ব দেন এবং তিনি মিছিল থেকে গ্রেফতার হন। সেই সময় তিনি প্রায় তিন বছর জেলে ছিলেন।

জেল থেকে মুক্তি পেয়ে ফিরে আসার কয়েক দিন পর ভিপি মোহাম্মদ উল্যাহর পিতা মারা যান। পিতার মৃত্যুর পর কঠিন সময়েও তিনি আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ সহ সকল অঙ্গসংগঠনের হাল ধরে রাখেন। এছাড়াও সেই সময় আর্থিকভাবে দলের কার্যক্রমে সহযোগিতা করার মতো কেউ ছিলনা অথবা সমর্থন থাকলেও সাহস করতো না। কিন্তু তিনি খেয়ে না খেয়ে অনেক কষ্ট করে দলের হাল ধরে রেখেছিলেন।

১৯৮১ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দলের সভানেত্রী হওয়ার পর প্রথম জনসভা হয় নোয়াখালীতে। সেই জনসভা সফল করার জন্য দায়িত্ব অর্পিত হয় ভিপি মোহাম্মদ উল্লার উপর এবং বৃহত্তর নোয়াখালীতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে জনসভা সফল করেন।

১৯৮১ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি এরশাদ বিরোধী বিভিন্ন আন্দোলন অংশগ্রহণের কারণে একাধিকবার গ্রেফতার ও নির্যাতনের শিকার হন। ১৯৯১ সালে চৌমুহনীতে ১৬ই ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের বিজয় দিবসের মিছিল চলাকালে আততায়ীরা ভিপি মোহাম্মদ উল্যাহকে লক্ষ করে বোমা হামলা করে এবং মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন কিন্তু এই ত্যাগি রাজনৈতিক হারিয়েছেন মূল্যবান একটি চোখ। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা উনার চিকিৎসা ও কৃত্রিম চোখ সংযুক্ত করার ব্যবস্থা করেন।

১৯৭৩ সালের পর (২০০৯ সালের ২২ জানুয়ারী) ভিপি মোহাম্মদ উল্যাহ আওয়ামী লীগের কোন নেতা হিসেবে প্রথম বেগমগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ব্যক্তি জীবনে তিনি মিশুক, অহিংসা ও ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি অনেক দায়িত্ব পালন করলেও কখনোই নিজের স্বার্থে মরিয়া ছিলেন না। আর জীবনের শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত উনার এই চেষ্টা অব্যাহত অব্যাহত থাকতে দেখেছি আমরা।

কিছু লেখা ও তথ্যের কার্টেসিঃ নাসির উদ্দিন বাদল

Top